রচনা
সময়ানুবর্তিতা
ভূমিকা: সময়ানুবর্তিতা বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক কাজ সম্পন্ন
করা। মানুষ তার প্রতিটি কাজে সময়ের সঙ্গে বাঁধা। আমরা ঘুম থেকে ওঠা, খাওয়া-দাওয়া, স্কুলে
যাওয়া কিংবা খেলাধুলা—সব কিছুই সময় মেনে করি। জীবনের প্রতিটি সাফল্যের
পেছনে সময়ানুবর্তিতা অন্যতম কারণ। যেমন একজন ছাত্র যদি সময়মতো পড়াশোনা না করে, তাহলে
পরীক্ষায় ভালো ফল করা সম্ভব নয়। আবার একজন কর্মচারী যদি সময়মতো অফিসে না যায়, তবে সে
তার কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস হারাবে। এভাবেই সময়ের সঠিক ব্যবহার একজন মানুষের জীবনকে সুশৃঙ্খল
ও সফল করে তোলে। এজন্য সময়ানুবর্তিতাকে জীবনের মূলমন্ত্র বলা হয়।
সময়ের গুরুত্ব: সময় পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটি নদীর স্রোতের মতো অবিরাম প্রবাহিত
হতে থাকে। একবার চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না। হারানো অর্থ, হারানো স্বাস্থ্য কিংবা
হারানো বন্ধু—এসব কিছুই অনেক সময় পরিশ্রমের মাধ্যমে ফেরত পাওয়া যায়।
কিন্তু একবার সময় নষ্ট হলে তা আর কোনোভাবে ফেরত পাওয়া যায় না। এজন্য সময়কে বলা হয়
“অমূল্য ধন।” প্রবাদে আছে—“সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।”
এই প্রবাদ থেকেই আমরা বুঝতে পারি যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানো কতটা জরুরি।
মানবজীবনে সময়ের প্রভাব: মানবজীবন সীমিত এবং ক্ষণস্থায়ী। গড়ে একজন
মানুষের জীবনকাল মাত্র কয়েক দশক। এই স্বল্প সময়ে জীবনের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সময়ের
সঠিক ব্যবহার করতে হয়। যেমন একজন ডাক্তার যদি সময়মতো রোগীকে চিকিৎসা না দেন, তবে রোগীর
জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। একইভাবে একজন ব্যবসায়ী যদি বাজারের সুযোগ সময়ে কাজে লাগাতে না পারে,
তবে সে ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই বলা যায়—সময়কে কাজে লাগাতে
না পারলে মানুষের জীবন ব্যর্থতায় পরিণত হয়।
সময় নষ্টের ক্ষতি: যে মানুষ সময়কে অবহেলা করে, সে আসলে নিজের জীবনকে অবহেলা করে। অকারণে সময়
নষ্ট করলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। যেমন ছাত্রজীবনে পড়াশোনার সময়কে
নষ্ট করলে জীবনে আর কখনো সেই শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাওয়া যায় না। আবার কাজের বয়সে পরিশ্রম
না করলে বার্ধক্যে কোনো লাভ হয় না। সময় নষ্ট করা মানে জীবনের মূলধন অপচয় করা। তাই অকারণে
আলস্য ও গড়িমসি জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
ছাত্রজীবনে সময়ানুবর্তিতা: ছাত্রজীবন হলো জীবনের ভিত্তি। এ সময়ে যে জ্ঞান অর্জন করা হয়, তা সারাজীবন
কাজে লাগে। যদি ছাত্ররা সময়ানুবর্তিতা না শিখে, তবে ভবিষ্যৎ জীবন অন্ধকার হয়ে যায়।
একজন নিয়মিত ছাত্র সবসময় সময়মতো স্কুলে যায়, সময়মতো পড়াশোনা করে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি
নেয়। এর ফলে সে ভালো ফলাফল করতে পারে। অন্যদিকে যে ছাত্র সময় নষ্ট করে, সে পরীক্ষায়
খারাপ ফলাফল করে এবং জীবনে পিছিয়ে পড়ে। তাই ছাত্রজীবন থেকেই সময়ানুবর্তিতার অভ্যাস
গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
কর্মজীবনে সময়ানুবর্তিতা: কর্মজীবন হলো দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের সময়। একজন চাকরিজীবী যদি প্রতিদিন
দেরি করে অফিসে যায়, তবে তার কাজে শৃঙ্খলা থাকবে না এবং সে কর্তৃপক্ষের আস্থা হারাবে।
আবার একজন ব্যবসায়ী যদি সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করে, তবে সে ক্রেতার বিশ্বাস হারাবে।
সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়—সময়ানুবর্তিতা ছাড়া কোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন
হয় না। এজন্য কর্মজীবনে সময়ানুবর্তিতা হলো সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
পারিবারিক জীবনে সময়ের মূল্য: শুধু শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে নয়, পারিবারিক জীবনেও সময়ানুবর্তিতা অত্যন্ত
জরুরি। পরিবার হলো সমাজের ক্ষুদ্রতম একক। যদি পরিবারের সদস্যরা সময়মতো তাদের কাজ না
করে, তবে পরিবারে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। যেমন—সময়ে খাবার তৈরি
না হলে সবাই অস্বস্তিতে পড়ে, সময়মতো পড়াশোনা না করলে সন্তানরা পিছিয়ে পড়ে, আবার সময়মতো
বিশ্রাম না নিলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। তাই সুখী পরিবার গঠনের জন্যও সময়ানুবর্তিতা
প্রয়োজন।
সমাজজীবনে প্রভাব: সমাজ হলো অনেক মানুষের সমষ্টি। সমাজের প্রতিটি সদস্য যদি সময়ানুবর্তী হয়,
তবে সমাজ অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়। যেমন—ট্রাফিক পুলিশ যদি
সময়ে দায়িত্ব পালন না করে, তবে শহরে যানজট সৃষ্টি হয়। আবার শিক্ষকরা যদি সময়মতো ক্লাসে
না আসেন, তবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রত্যেককে
তার দায়িত্ব সময়ে সম্পন্ন করতে হবে।
জাতীয় জীবনে সময়ানুবর্তিতা: একটি দেশের উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করে নাগরিকদের সময়ানুবর্তিতার উপর।
যদি দেশের মানুষ সময়মতো কাজ করে, তবে দেশ দ্রুত অগ্রসর হয়। যেমন—জাপান ও জার্মানির
উন্নতির অন্যতম রহস্য হলো তাদের নাগরিকদের সময়ানুবর্তিতা। অন্যদিকে আমাদের দেশে অনেক
সময় কাজের দেরির কারণে উন্নয়ন প্রকল্প থেমে যায়। ফলে দেশের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। তাই
জাতীয় জীবনে উন্নতির জন্য সময়ানুবর্তিতা অপরিহার্য।
সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা: সময়ানুবর্তিতা মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে।
শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না। একজন খেলোয়াড় যদি নিয়মিত সময়মতো অনুশীলন
না করে, তবে সে খেলায় ভালো করতে পারবে না। একইভাবে সেনাবাহিনী যদি সময়মতো আদেশ পালন
না করে, তবে দেশের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। তাই শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সময়ানুবর্তিতা অপরিহার্য।
পরিকল্পনা ও সময়ের ব্যবহার: সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করার জন্য
পরিকল্পনা অত্যন্ত প্রয়োজন। পরিকল্পনা ছাড়া সময়ের সঠিক ব্যবহার সম্ভব নয়। যেমন একজন
ছাত্র যদি প্রতিদিনের পড়াশোনার পরিকল্পনা না করে, তবে তার পড়াশোনায় অগ্রগতি হবে না।
আবার একজন ব্যবসায়ী যদি বছরের কাজের পরিকল্পনা না করে, তবে সে লাভবান হবে না। তাই প্রতিটি
মানুষেরই সময়ের পরিকল্পনা করে কাজ করা উচিত।
স্বাস্থ্য ও সময়ানুবর্তিতা: স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্যও সময়ানুবর্তিতা জরুরি। নিয়মিত সময়ে ঘুমানো,
খাওয়া-দাওয়া করা, পড়াশোনা করা এবং শরীরচর্চা করা—এসবের মাধ্যমে মানুষ
সুস্থ থাকতে পারে। সময়ের অসংগতি মানুষের শরীর ও মনের উপর খারাপ প্রভাব ফেলে। যেমন—রাতে দেরি করে ঘুমালে
সকালে দেরি করে উঠতে হয়, ফলে সারাদিন মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয়। তাই স্বাস্থ্য রক্ষার
জন্য সময়ানুবর্তিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক জীবনে সময়ের মূল্য: অর্থনৈতিক জীবনে সময়ই আসল সম্পদ। যারা সময়মতো কাজ করতে পারে, তারা অর্থনৈতিকভাবে
সফল হয়। যেমন—একজন কৃষক সময়মতো বীজ বপন করলে ভালো ফলন পায়। আবার একজন
ব্যবসায়ী যদি সময়মতো পণ্য বাজারে আনে, তবে সে লাভবান হয়। যারা সময়ের মূল্য বোঝে না,
তারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সময়ানুবর্তিতা: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির
প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বিজ্ঞানীরা যদি সময়মতো গবেষণা সম্পন্ন না
করেন, তবে নতুন আবিষ্কার থেমে যায়। যেমন মহাকাশযাত্রার ক্ষেত্রে প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত
মূল্যবান। যদি নির্দিষ্ট সময়ে মহাকাশযান উৎক্ষেপণ না করা হয়, তবে কোটি কোটি টাকা ক্ষতি
হতে পারে। এজন্য বিজ্ঞান জগতে সময়ানুবর্তিতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় জীবনে সময়ানুবর্তিতা: ধর্মীয় জীবনেও সময়ের গুরুত্ব রয়েছে।
ইসলাম ধর্মে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নির্দিষ্ট সময়ে পড়তে হয়। হিন্দু ধর্মেও পূজা-অর্চনা
নির্দিষ্ট সময়ে করা হয়। খ্রিষ্টান ধর্মে রবিবার গির্জায় প্রার্থনা করা হয়। সব ধর্মেই
সময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই ধর্মীয় জীবনেও সময়ানুবর্তিতা একটি অপরিহার্য গুণ।
সময় অপচয়ের ক্ষতি: যদি মানুষ সময়ের মূল্য না বোঝে, তবে জীবনে নানা সমস্যা দেখা দেয়। দেরি
করার অভ্যাস মানুষকে পিছিয়ে দেয়। যেমন একজন ছাত্র যদি প্রতিদিন বলে—“কাল থেকে পড়াশোনা
শুরু করব,” তবে সে কখনোই প্রস্তুতি নিতে পারবে না। সময় অপচয়ের কারণে সে পরীক্ষায় খারাপ
করবে এবং ভবিষ্যতে ভালো চাকরি পাবে না। তাই বলা যায়—সময় নষ্ট করা মানে
নিজের ভাগ্য নষ্ট করা।
সময়ানুবর্তিতা ও সফলতা: জীবনে যারা সফল হয়েছে, তাদের জীবনী পড়লে দেখা যায় তারা সবাই সময়ানুবর্তী
ছিলেন। যেমন—আব্রাহাম লিঙ্কন, মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমান—এদের প্রত্যেকের
জীবনেই সময়ানুবর্তিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যারা সময়ের মূল্য বোঝে, তারাই
ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে। তাই সফল জীবনের জন্য সময়ানুবর্তিতা অপরিহার্য।
আমাদের করণীয়: আমাদের প্রত্যেককে সময়ের মূল্য বুঝতে হবে। এজন্য প্রতিদিনের কাজের তালিকা
তৈরি করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। আলস্য ও দেরি করার অভ্যাস পরিহার করতে
হবে। ছোটবেলা থেকেই সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা নিতে হবে। তবেই জীবনে আমরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য
অর্জন করতে পারব।
উপসংহার: সবশেষে বলা যায়—সময়ানুবর্তিতা ছাড়া মানুষের জীবন কখনোই সুন্দর
ও সফল হয় না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—শিক্ষা, কর্ম, পরিবার,
সমাজ, রাষ্ট্র—সব জায়গাতেই সময়ানুবর্তিতা অত্যন্ত জরুরি। তাই আমাদের
সবারই উচিত সময়ের সঠিক ব্যবহার করা। সময়কে কাজে লাগিয়েই আমরা গড়ে তুলতে পারি একটি সফল
ও সমৃদ্ধ জীবন।

0 Comments